বশিকরণ

মহিলা/স্ত্রী/নারী/মেয়ে বশীকরণ#লোক/পূরুষ/মানুষ্য বশীকরণ বা বাধ্য করা

তান্ত্রিক চিকিৎসা ও আমাদের কিছু সার্বজনীন ভুল: বশীকরণ আসলে কী?

মহিলা/স্ত্রী/নারী/মেয়ে বশীকরণ#লোক/পূরুষ/মানুষ্য বশীকরণ বা বাধ্য করা

আমরা প্রায়শই জীবনের কোনো এক পর্যায়ে এসে এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হই। আমাদের খুব চিরচেনা, কাছের এবং ভালোবাসার মানুষটি হঠাত করেই যেন বদলে যায়। অকারণেই দূরত্ব তৈরি হয়, কিংবা সে অন্য কারও প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এই আকস্মিক পরিবর্তন আমাদের হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। অনেক সময় বেঁচে থাকার অর্থটাই হারিয়ে যায়।

যখন কোনোভাবেই তাকে ফেরানো যায় না বা পূর্বের সেই ভালোবাসায় জড়ানো যায় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মানসিক ভারসাম্য বা চিন্তাশক্তি লোপ পায়। যেকোনো মূল্যে সেই প্রিয় মানুষকে ফিরে পাওয়ার জন্য এক ব্যাকুলতা তৈরি হয়। আর এই চরম দিকবিদিকশূন্য মুহূর্তেই আমাদের মাথায় আসে তান্ত্রিকতা, আকর্ষণ কিংবা বশীকরণের কথা।

সঠিক মানুষ চেনার ভুল ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

এই অবস্থায় আমরা বন্ধু-বান্ধব বা পরিচিত মহলে খোঁজখবর নিতে শুরু করি। অনেকে অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুসন্ধান করি। আবার কারও হয়তো মনে পড়ে যায় রাস্তাঘাটে দেখা বিভিন্ন চটকদার লিফলেট কিংবা ‘২৪ ঘণ্টায় মুশকিল আসান’ মার্কা সাইন বোর্ডের কথা।

দুর্ভাগ্যবশত, এই সময়ে এসে শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষই সঠিক তান্ত্রিক বা পথ চিনতে ভুল করেন।

বর্তমানে আমাদের চারপাশে যেমন ভুঁইফোড় জীন হুজুর, জীন মাতা বা কালী সাধকের অভাব নেই; তেমনি অনলাইনেও তৈরি হয়েছে এক শ্রেণীর অল্প বয়সী, নষ্ট বুদ্ধির ‘ফেসবুক বা ব্লগার তান্ত্রিক’। বিশেষ করে যারা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ব্যবহার করেন, তারা বিভিন্ন অ্যাপ বা ভিডিও ডাউনলোড করতে গিয়ে এমন হাজারো হাইব্রিড তান্ত্রিকের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে থাকবেন। (আমরা ইতিপূর্বে ভুয়া তান্ত্রিক চেনার উপায় নিয়ে বেশ কয়েকটি পোস্ট করেছি, তাই আজ সে বিষয়ে বিস্তারিত যাব না।)

আসল তান্ত্রিকের শরণাপন্ন হয়েও কেন ফল পেতে দেরি হয়?

আজকের মূল আলোচনা তাদের নিয়ে, যারা একজন প্রকৃত বা গুণী তান্ত্রিকের কাছে যাওয়ার পরেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে বিলম্ব দেখছেন। এর প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. সমস্যার সঠিক বিশ্লেষণ না করা

যেকোনো সমাধানের প্রথম ধাপ হলো সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করা। যতক্ষণ না আপনি সম্পর্কের অবনতির আসল কারণটি নিজে বুঝতে পারছেন বা তান্ত্রিক মহোদয়কে দিয়ে বিশ্লেষণ করাচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক তদবির বা ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।

২. তান্ত্রিকতা এক প্রকার আধ্যাত্মিক চিকিৎসা

মনে রাখবেন, তান্ত্রিকতা হলো এক ধরণের আধ্যাত্মিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, যাকে আপনি একপ্রকার ‘মনোচিকিৎসাও’ বলতে পারেন। কোনো শারীরিক রোগের চিকিৎসার জন্য যেমন প্রথমে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার (Diagnosis) মাধ্যমে মূল রোগটি ধরা হয়, তান্ত্রিকতার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই।

যেমন—একটি সাধারণ প্যারাসিটামল ট্যাবলেট দিয়ে সব ধরনের জ্বর নিরাময় হয় না; ঠিক তেমনি যেকোনো একটা বশীকরণ তদবির করলেই যে কেউ আপনার বাধ্য হয়ে যাবে—এমনটা ভাবা নিতান্তই মূর্খতা।

৩. প্রেক্ষাপট ও মানুষের ভিন্নতা

পৃথিবীতে প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রায় ৭৩ হাজারেরও বেশি বশীকরণ মন্ত্র, দোয়া বা তাবিজের সৃষ্টি হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির মানুষের জন্য তন্ত্রের ধরণও ভিন্ন হয়। একটি নিখুঁত তদবিরের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অনুসন্ধান করা জরুরি:

  • target ব্যক্তিটির আচরণ, স্বভাব এবং তার ভালো-লাগা ও মন্দ-লাগা কেমন?

  • তার বংশগত বা পারিবারিক চরিত্র কেমন?

  • বর্তমানে তার জীবনে নতুন কোনো সঙ্গী এসেছে কি না?

  • তার জন্ম তারিখ বা সঠিক কোষ্ঠী কী?

  • তার ওপর পূর্বে কোনো তদবির করা হয়েছিল কি না, কিংবা বর্তমানে ভিন্ন কোনো ধর্মের তদবির চলছে কি না?

  • অতীতে তার অন্য কোনো পছন্দের মানুষ ছিল কি না?

যিনি তদবির করাতে এসেছেন, তার পক্ষে যদি এই তথ্যগুলো বের করা সম্ভব না হয়, তবে অবশ্যই একজন দক্ষ তান্ত্রিককে দিয়ে এই বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে জেনে নিতে হবে। তবেই একজন নারী বা পুরুষকে আধ্যাত্মিক উপায়ে প্রভাবিত করা সম্ভব। অন্যথায় আপনার সময়, শ্রম এবং অর্থ—সবই জলে ভাসবে।

জীন-পরীর মিথ্যা আশ্বাস ও ভণ্ডামির ফাঁদ

যদি কোনো তান্ত্রিক আপনাকে দাবি করে যে, তার কাছে জীন বা পরী আছে এবং সেগুলোর মাধ্যমে সে ২৪ ঘণ্টা বা ৭ দিনের মধ্যে আপনার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে এনে হাজির করবে—তবে আমাদের পরামর্শ থাকবে: সেই সকল তান্ত্রিক হতে শতহাত দূরে থাকুন।

এই শ্রেণীর ভণ্ডরাই মূলত তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের গায়ে কলঙ্কের দাগ লেপে দিচ্ছে। একটু যৌক্তিকভাবে ভেবে দেখুন:

  • ছোটবেলায় আলিফ লায়লা বা আলাদিনের চেরাগের গল্প নিশ্চয়ই দেখেছেন? আলাদিনের কাছে মাত্র একটি জীন ছিল, তাতেই সে এক বিশাল রাজ্যের মালিক হয়ে রাজকন্যাকে বিয়ে করে সুখে শান্তিতে বাস করেছিল।

  • তাহলে এই জীন পালনকারী তান্ত্রিকেরা কেন সামান্য কিছু টাকার জন্য আপনার পেছনে ঘুরে কাজ করে দিচ্ছে? তাদের জীন যদি এতই শক্তিশালী হতো, তবে তারা জীনের মাধ্যমেই কোটি কোটি টাকা এনে নিতে পারত, কিংবা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মূল্যবান কোষ্ঠী পাথর খুঁজে বের করে ধনী হয়ে যেত!

শেষ কথা

নিজে ভাবুন এবং অন্যকেও যুক্তি দিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করুন। মনে রাখবেন, তান্ত্রিকতা কোনো অলৌকিক ম্যাজিক বা ভোজবাজি নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক চিকিৎসা পদ্ধতি মাত্র। এর মাধ্যমে অনেক অসাধ্য সাধন সম্ভব, তবে ভণ্ডরা আপনাকে যে অসম্ভব ও কাল্পনিক স্বপ্নের ঘোরে ডুবিয়ে রাখে—তা থেকে সর্বদা সতর্ক থাকুন।

ব্যবহার বিধি

- অন্যের স্বাধীন ইচ্ছা বা সম্মতির বিরুদ্ধে কোনো প্রয়োগ করবেন না।
- সম্পর্কে প্রতারণা, জোরজবরদস্তি বা ক্ষতিকর উদ্দেশ্য এড়িয়ে চলুন।
- নিজেকে উন্নত করা, আত্মবিশ্বাস ও সম্পর্কের সততা—এসবকে অগ্রাধিকার দিন।