সাধনা

তন্ত্রসাধনার রহস্যময় কেন্দ্র: অষ্টমাতৃকা ও ৬৪ যোগিনী সাধনার ইতিবৃত্ত

ঐতিহ্য, প্রতীকী ব্যাখ্যা ও সচেতনতা বিষয়ে মন্ত্রগুরু এ্যাসোসিয়েশনের প্রাচীন অভিজ্ঞতা, আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবহারিক নির্দেশনার আলোকে প্রস্তুত প্রবন্ধ।

তন্ত্রসাধনার রহস্যময় কেন্দ্র: অষ্টমাতৃকা ও ৬৪ যোগিনী সাধনার ইতিবৃত্ত

সুপ্রভাত। আজকের বিশেষ প্রতিবেদন: অষ্টমাতৃকা ও চৌষট্টি যোগিনী (পুনঃপ্রচার)

সনাতন তথা ভারতীয় পৌরাণিক শাস্ত্রে 'যোগিনী' এবং 'অষ্টমাতৃকা' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রহস্যময় অধ্যায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে এদের নিয়ে নানা কৌতুহল রয়েছে। আজকের আলোচনায় আমরা জানবো—কারা এই যোগিনী, পৌরাণিক শাস্ত্রে এদের অবস্থান কী এবং ভারতে অবস্থিত এদের ঐতিহাসিক মন্দিরগুলোর স্থাপত্যশৈলী কেমন।

যোগিনী ও অষ্টমাতৃকার পরিচয় এবং ইতিহাস

পৌরাণিক আখ্যান অনুসারে, যোগিনীরা হলেন দেবী কালিকার সহচরী। তবে সৃষ্টির আদি শক্তি মহামায়ার আংশিক রূপ হলেন ‘অষ্টমাতৃকা’ (আটজন প্রধান দেবী)। এই অষ্টমাতৃকার এক একজনের আবার আটজন করে সহচরী বা পরিচারিকা রয়েছেন। এই আট মাতৃকার মোট $8 \times 8 = 64$ জন সহচরীকে একত্রে ‘৬৪ যোগিনী’ বলা হয়।

ঐতিহাসিক পটভূমি: নবম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতে এই যোগিনী উপাসনা ও তন্ত্রসাধনা বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল বলে মনে করা হয়। ভারতের বিখ্যাত কিছু ধর্মগ্রন্থ ও প্রাচীন সাহিত্য যেমন—ভাগবত পুরাণ, ব্রহ্ম পুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ এবং কথাসরিৎসাগর-এ আদি শক্তির এই সহচরীদের উল্লেখ পাওয়া যায়।

গবেষকদের মতে, প্রাচীনকালে এই বিশ্বাসটি হয়তো আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাধ্যমে এসেছিল, যারা মূলত গ্রাম্য দেবী বা প্রকৃতির পূজারি ছিলেন। পরবর্তীকালে সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে এই লোকবিশ্বাসগুলো শাক্তবাদ (দেবী শক্তির আরাধনা) ও তন্ত্রবাদে রূপান্তরিত হয়। ১৬ই শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, আনুষ্ঠানিকভাবে এই শক্তি সাধনা বা ডাকিনী বিদ্যা শেখানো হতো।

যোগিনীদের অলৌকিক ক্ষমতা ও মন্দিরের ছাদ না থাকার রহস্য

তন্ত্রশাস্ত্রে মনে করা হয়, যারা এই যোগিনী বিদ্যায় সিদ্ধি লাভ করতেন, তারা অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী হতেন। তারা নিজেদের মন ও শরীরের শক্তি দ্বারা প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারতেন—যেমন নিজেদের ইচ্ছায় বৃষ্টিপাত ঘটানো, দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত করা কিংবা ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার প্রয়োগে কোনো কিছু বিনাশ করা। বশীকরণ ও নানা জটিল জাদুবিদ্যায় তারা পারদর্শী ছিলেন।

তাদের অন্যতম একটি বিশেষ ক্ষমতা ছিল আকাশে উড়ে বেড়ানো। লোকবিশ্বাস ও তান্ত্রিক মতানুসারে, যোগিনীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্যই প্রতিটি যোগিনী মন্দিরের কোনো ছাদ থাকে না; এগুলো মূলত উন্মুক্ত আকাশী (Hypaethral) মন্দির হয়।

ভারতের প্রধান ৫টি যোগিনী মন্দির

প্রাচীন ভারতে তন্ত্রবিদ্যা অনুশীলনের কেন্দ্র হিসেবে বেশ কিছু বৃত্তাকার যোগিনী মন্দির নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে আবিষ্কৃত প্রধান ৫টি মন্দির হলো:

  1. মিটাবালি বা মিটাওলি যোগিনী মন্দির (মধ্যপ্রদেশ): এটি 'একান্তেশ্বরা মহাদেব মন্দির' নামেও পরিচিত। এই বৃত্তাকার মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অনুকরণ করেই ব্রিটিশ স্থপতি স্যার এডউইন লুটিয়েন্স ভারতের পুরনো সংসদ ভবনের (Parliament House) নকশা তৈরি করেছিলেন।

  2. খাজুরাহো যোগিনী মন্দির (মধ্যপ্রদেশ): এটি ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন ৬৪ যোগিনী মন্দির বলে মনে করা হয়।

  3. জব্বলপুর যোগিনী মন্দির (মধ্যপ্রদেশ): এর অপর নাম 'শ্রী গৌরী-শঙ্কর মন্দির'। ধারণা করা হয়, ১০০০ শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

  4. হীরাপুর যোগিনী মন্দির (ওড়িশা): এটি ভারতের আবিষ্কৃত চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরগুলোর মধ্যে আকারে সবচেয়ে ছোট ও অত্যন্ত সুসংরক্ষিত।

  5. রানীপুর-ঝরিয়াল যোগিনী মন্দির (ওড়িশা): এই মন্দিরের উল্লেখ পাণিনির বিখ্যাত ব্যাকরণ গ্রন্থ এবং বহু পুরাণে পাওয়া যায়। পুরাণে একে তৃতীয় শতাব্দীর 'সোমতীর্থ' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লৌকিক যোগিনী বিদ্যা

ভারতের মূল ধারার ধর্মচর্চা থেকে কিছুটা বিচ্যুত হলেও, বর্তমানেও ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নারীদের মধ্যে এক বিস্ময়কর লৌকিক জাদুবিদ্যার অনুশীলন লক্ষ্য করা যায়।

প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, এই সাধনায় লিপ্ত মহিলারা গভীর রাতে স্বামীকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে গভীর জঙ্গলে চলে যান। সেখানে তারা প্রফুল্লতার দেবতা 'বঙ্গাস'-এর উদ্দেশ্যে গান ও নৃত্যে মেতে ওঠেন। বলা হয়, এদের পোষ্য বা বাহন হয় বাঘ এবং ভোর হওয়ার আগেই তারা ঘরে ফিরে আসেন। সাঁওতালদের বিশ্বাস—এই বিদ্যা কেউ জন্মসূত্রে পায় না, কঠোর ও দুর্গম সাধনার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। তবে এই লৌকিক সাধিকারা মূল শাস্ত্রীয় ৬৪ যোগিনীর আওতাভুক্ত নন।

প্রধান আট যোগিনী (অষ্টমাতৃকা)

আদি মহাশক্তির জগৎ পরিচালনার কাজে সাহায্যকারী প্রধান আটজন যোগিনী বা অষ্টমাতৃকার নাম নিচে দেওয়া হলো:

১) সুরসুন্দরী, ২) মনোহরা, ৩) কনকবতী, ৪) কামেশ্বরী, ৫) রতিসুন্দরী, ৬) পদ্মিনী, ७) নটিনী, ৮) মধুমতী।

হীরাপুর যোগিনী মন্দিরের বিশেষ বর্ণনা

ওড়িশার হীরাপুরে অবস্থিত যোগিনী মন্দিরটির স্থাপত্য ও ভাস্কর্য অনন্য। নিচে এই মন্দিরের কাত্যায়নী ও যোগিনীদের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

নব-কাত্যায়নী (মন্দিরের বাইরের দেওয়াল)

মন্দিরের বাইরের বৃত্তাকার দেওয়ালে খোদাই করা ৯ জন দেবীর মূর্তি দেখা যায়, যাদের একত্রে 'নব-কাত্যায়নী' বলা হয়। ঘড়ির কাঁটার সজ্জা অনুসারে সাজানো এই মূর্তিগুলো হলদেটে বেলেপাথরে নির্মিত এবং এদের উচ্চতা ২ ফুট ৬ ইঞ্চি থেকে ২ ফুট ১১ ইঞ্চির মধ্যে। প্রতিটি মূর্তিই দ্বিভূজা (দুই হাত বিশিষ্ট) এবং মানুষের একটি করে কাটা মস্তকের (ছিন্নমস্তক) ওপর দণ্ডায়মান।

  • ১ম কাত্যায়নী: ডান হাতে তরবারি পরিহিতা, অলংকারে সজ্জিতা। সঙ্গে ঢাক ও বাদ্যযন্ত্রসহ দুজন পুরুষ পরিচারক রয়েছে।

  • ২য় কাত্যায়নী: মাথায় সুন্দর খোঁপা, মুকুট ও অলংকার পরিহিতা। একজন পুরুষ পরিচারক মাথায় ছত্র (ছাতা) ধরে আছে। পদতলে একটি কুকুর (সারমেয়) ও একটি শিয়াল (শৃগাল) বিদ্যমান।

  • ৩য় কাত্যায়নী: এক হাতে ছুরি এবং অন্য হাতে নরকপাল (খুলি) ধারণ করে আছেন। নারী পরিচারিকা মাথায় ছাতা ধরে আছে। সঙ্গী হিসেবে পদতলে সারমেয় ও শৃগাল রয়েছে।

  • ৪র্থ কাত্যায়নী: রুদ্রাক্ষের বাজুবন্ধ পরিহিতা। পদতলে সারমেয় ও শৃগাল। একজন পরিচারিকা সারমেয়কে খাদ্য দান করছে এবং অন্যজন মাথায় ছত্র ধারণ করে আছে।

  • ৫ম কাত্যায়নী: গঠনগতভাবে দ্বিতীয় কাত্যায়নীর অনুরূপ। মাথায় নারী পরিচারিকার ছত্র এবং পদতলে সারমেয় ও শৃগাল রয়েছে।

  • ৬ষ্ঠ কাত্যায়নী: চতুর্থ কাত্যায়নীর সমরূপ। ডান পাশে একটি ছোট গাছ এবং পরিচারিকার হাতে অর্ধচন্দ্রাকৃতির ছত্র রয়েছে।

  • ৭ম ও ৮ম কাত্যায়নী: এই দুটি মূর্তি তৃতীয় কাত্যায়নীর অবয়বের ন্যায়।

  • ৯ম কাত্যায়নী: দেবীর নগ্ন, রুদ্র রূপ। এক হাতে তরবারি ও অন্য হাতে নরকপালের পাত্র। সঙ্গে ধনুক রয়েছে। কোনো পরিচারিকা নেই, তবে পদতলে সারমেয়, শৃগাল ও ছিন্নমস্তক রয়েছে।

চৌষট্টি যোগিনীর মূর্তিতাত্ত্বিক বিবরণ (অভ্যন্তরীণ কুলুঙ্গি)

মন্দিরের ভেতরের দেওয়ালে খোদাই করা মূল যোগিনীদের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো। এই মূর্তিগুলো নরম গ্রানাইট ও ধূসর বর্ণের ক্লোরাইট পাথর দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত মিনিয়েচার নকশায় তৈরি, যার উচ্চতা প্রায় ২ ফুট।

নংযোগিনীর নামবাহন/অবস্থানবৈশিষ্ট্য ও রূপ
বহুরূপাপুরুষ মরদেহচতুর্ভূজা, মাথায় বিশাল খোঁপা এবং বিভিন্ন অলংকারে সজ্জিতা।
তারামৃত শরীরদ্বিভূজা, মাথায় বাম দিকে সুন্দর খোঁপা।
নর্মদাহস্তী (হাতি)দ্বিভূজা, মুণ্ডমালা পরিহিতা। নরকপালে রক্ত নিয়ে পানের ভঙ্গিমায় রত।
যমুনাকচ্ছপচতুর্ভূজা, অবিন্যস্ত কেশরাশি, ডান হাতে নরকপাল পাত্র।
শান্তি / লক্ষ্মীপ্রস্ফুটিত পদ্মদ্বিভূজা, অলংকারের পাশাপাশি সর্প (সাপ) বাজুবন্ধ পরিহিতা।
বারুণী / ভারুণীজলতরঙ্গ খোদাইদ্বিভূজা, মাথায় বাম দিকে খোঁপা, মস্তক অলংকারে সজ্জিত।
ক্ষেমঙ্করীকুমিরচতুর্ভূজা, সুসজ্জিত খোঁপা, মালা ও কোমরবন্ধ পরিহিতা।
আদ্রিহস্তীদ্বিভূজা, মাথায় সুন্দর খোঁপা।
বরাহীমেষ (ভেড়া)চতুর্ভূজা, বন্য শূকরের মুখমণ্ডল। এক হাতে মুণ্ডপাত্র ও অন্য হাতে ধনুক।
১০রণভীরাফণাধারী ভুজঙ্গ (সাপ)রুদ্রমূর্তি, মুণ্ডমালা পরিহিতা, ডান হাতে খড়্গ (তরবারি)।
১১বানর-মুখীউটচতুর্ভূজা, মুখমণ্ডল বানরের ন্যায়।
১২বৈষ্ণবীগরুড়দ্বিভূজা, সুতনু সুশ্রী অবয়ব, কোঁকড়ানো কেশরাশি।
১১কালরাত্রিভাল্লুকদ্বিভূজা, কমনীয় অঙ্গ, মাথায় সুন্দর খোঁপা।
১৪বৈদ্যরূপাঢাক (বাদ্যযন্ত্র)দ্বিভূজা, সুসজ্জিত খোঁপা।
১৫চর্চিকাঅর্ধশায়িত পুরুষ দেহদ্বিভূজা, পরাস্ত অসুরের কোমরে দা এবং দেবীর হাতে পদ্মফুল।
১৬বৈতালী / বেতালিমৎস্য (মাছ)চতুর্ভূজা, সুসজ্জিত খোঁপা ও মুণ্ডমালা পরিহিতা।
১৭ছিন্নমস্তামানব ছিন্নমস্তকচতুর্ভূজা, বিশাল খোঁপা, বাম দিকের নিচের হাতে ধনুক।
১৮বৃষবাহনগুহার ছাদমহিষের মুখমণ্ডল বিশিষ্ট রুদ্ররূপিণী দেবী, অবিন্যস্ত কেশ।
১৯জ্বালা কামিনীবৃহৎ ব্যাঙদ্বিভূজা, কোমরবন্ধনী দ্বারা সুসজ্জিত পোশাক।
২০ঘটাভারাসিংহদ্বিভূজা, হস্তী বা হাতির ন্যায় মুখাকৃতি।
২১কারাকালীসারমেয় (কুকুর)দ্বিভূজা, দুই হাত দিয়ে পায়ের নূপুর ঠিক করার ভঙ্গিমায় দণ্ডায়মান।
২২সরস্বতীবৃহৎ নাগ (সাপ)চতুর্ভূজা, মুখে পুরুষালি গোঁফ রয়েছে, হাতে বীণাসদৃশ বাদ্যযন্ত্র।
২৩বীরূপাখোদাই করা তরঙ্গ রেখাদ্বিভূজা, মাথার ওপরে বৃহৎ খোঁপা।
২৪কৌবেরী / কাবেরী৭টি রত্ন ঘড়াদ্বিভূজা, মুকুট-কিরীটী ও রত্নখচিত মালা পরিহিতা।
২৫ভাল্লুকাপদ্ম লতাভাল্লুকের মুখাকৃতি, সারা শরীরে রোমশ ভাব, ডান হাতে ডমরু।
২৬নরসিংহীলতাপাতা ও ফুলচতুর্ভূজা, সিংহের মুখমণ্ডল ও কেশর, নিচে পাত্র ধারণ করা।
২৭বীর্যাকুঁড়িসহ পদ্মফুলদ্বিভূজা, কমনীয় শরীর, ডান দিকে সজ্জিতা খোঁপা।
২৮বিকটাননাভগ্ন বাহনদ্বিভূজা, রুদ্ররূপিণী, ঠোঁট দুটি পাখির চঞ্চুর (ঠোঁট) মতো।
২৯মহালক্ষ্মীফুটন্ত পদ্মদ্বিভূজা, সর্পমালা পরিহিতা, হাতে বজ্র ও সুরক্ষাদাল।
৩০কৌমারীময়ূরদ্বিভূজা, ডান হাতে রুদ্রাক্ষের মালা, বাঁ হাতটি ভাঙা।
৩১মহামায়াপূর্ণ বিকশিত পদ্মঅষ্টভুজা, মন্দিরের মূল অধিষ্ঠাত্রী দেবী। মুকুট ও অলংকারে ভূষিতা।
৩২রতী / ঊষাধনুর্ধারী মদনদেবদ্বিভূজা, ক্ষিপ্ত মূর্তি, হাতে তীর-ধনুক, কাঁধে তূণীর (তীর রাখার পাত্র)।
৩৩কর্করিবৃহৎ কাঁকড়াদ্বিভূজা, মাথার বাম দিকে খোঁপা, কর্ণাভরণ পরিহিতা।
৩৪সর্পসায়াভাঙা বাহনচার বাহু বিশিষ্টা, মুখমণ্ডল সর্পের ন্যায়।
৩৫যক্ষিণীচার পায়া বিশিষ্ট টেবিলদ্বিভূজা, মাথায় কিরীটী ও মুকুট পরিহিতা।
৩৬অঘোরাশৃঙ্গধারী ছাগলদ্বিভূজা, রুদ্ররূপিণী, মাথায় বিশালাকার উদ্ধত খোঁপা।
৩৭রুদ্রকালীকাকদ্বিভূজা, ডান হাতে তরবারি ধারণ করে আছেন।
৩৮বিনায়িকীগাধা (গর্ধভ)দুই বাহু বিশিষ্টা, হস্তী বা গণেশের ন্যায় মুখমণ্ডল।
৩৯বিন্ধ্যবাসিনীমূষিক (ইঁদুর)দ্বিভূজা, বাম হস্তে ধনুক ও ডান হস্তে তার টঙ্কার দেওয়ার ভঙ্গি।
৪০কুমারীবৃশ্চিক (বিছা)চতুর্ভূজা, সুতনু, ওপরের দুই হাত উদ্ধত।
৪১মহেশ্বরীষাঁড়চতুর্ভূজা, মাথায় ডান দিকে খোঁপা, সুন্দর কোমরবন্ধ।
৪২অম্বিকানকুলের পিঠে দুই চাকাচতুর্ভূজা, নিচের হাত হাঁটু ছুঁয়ে আছে, ওপরের ডান হাতে ডমরু।
৪৩কামিনীমোরগদ্বিভূজা, নানা অলংকারে সজ্জিতা, ডান দিকে খোঁপা।
৪৪ঘটাবরীসিংহদ্বিভূজা, কোঁকড়ানো কেশরাশি, অলংকার পরিহিতা।
৪৫স্তুতিহলুদ বাটার পাত্রচতুর্ভূজা, পাশে ফুলদানি, মাথায় ফুল দিয়ে সজ্জিত খোঁপা।
৪৬কালীঅর্ধশায়িত মহাদেব শিবদ্বিভূজা, শিবের বুকের ওপর দণ্ডায়মান, হাতে ত্রিশূল।
৪৭উমাপ্রস্ফুটিত পদ্মসমূহচতুর্ভূজা, ওপরের বাম হস্তে নাগপাশ, নিচের বাম হস্তে অভয় মুদ্রা।
৪৮নারায়ণীমাটির শঙ্কু আকৃতির পাত্রদ্বিভূজা, বাম হস্তে সুরাপাত্র এবং ডান হস্তে তরবারি।
৪৯সমুদ্রাশঙ্খদ্বিভূজা, মাথায় বাম দিকে খোঁপা, অলংকৃত অবয়ব।
৫০ব্রাহ্মণীপুস্তক (বই)চতুর্ভূজা, ত্রিমস্তক বিশিষ্টা, উপবীত বা পৈতা পরিহিতা। পাশে সিংহ।
৫১জ্বালামুখীআট পায়া বিশিষ্ট চৌকিদ্বিভূজা, লম্বকর্ণ বা লম্বা কান বিশিষ্ট দেবী।
৫২অগ্নিভেড়াদ্বিভূজা, ডান হস্তে তরবারি, মূর্তির পেছনে অগ্নিশিখা বিদ্যমান।
৫৩অদিতিটিয়াপাখিদ্বিভূজা, মাথার ওপরে সুদৃশ্য খোঁপা।
৫৪চন্দ্রকান্তীকাঠের চারপায়া চৌকিদ্বিভূজা, নানা অলংকার পরিহিতা, ডান দিকে খোঁপা।
৫৫বায়ুবেগাস্ত্রী চামরী গাইদ্বিভূজা, মাথায় সজ্জিত খোঁপা।
৫৬চামুণ্ডাকস্তুরী মৃগ (হরিণ)চতুর্ভূজা, কঙ্কালসার ভয়াল রূপ। ওপরে সিংহ, নিচে দা ও ছিন্নমস্তক।
৫৭মূর্তিশৃঙ্গধারী হরিণদ্বিভূজা, মাথায় খোঁপা ও শরীরে নানাবিধ গহনা।
৫৮গঙ্গামকরচতুর্ভূজা, ওপরের ডান হাতে পদ্ম, নিচের বাঁ হাতে নাগপাশ।
৫৯ধূমাবতীপার্বত্য রাজহাঁসদ্বিভূজা, দুই হাতে শস্য ঝাড়াইয়ের যন্ত্র (কুলো)।
৬০(সংগৃহীত তথ্যে অনুপস্থিত)
৬১সর্বমঙ্গলাকুলুঙ্গিটি বর্তমানে শূন্যপূর্বে মূর্তিটি থাকলেও বর্তমানে তা কোয়াখাইয়ের যমুনাকুণ্ডে স্থানান্তরিত।
৬২অজিতাপার্বত্য হরিণচতুর্ভূজা, নকশাদার সুন্দর পোশাক ও সুসজ্জিত খোঁপা।
৬৩সূর্যপুত্রীঘোড়াচতুর্ভূজা, তূণীর, ধনুক ও তীর ধারণ করে আছেন।
৬৪বায়ুবীণাকালো পুরুষ মৃগদ্বিভূজা, নৃত্যরত ভঙ্গিমা, পাশে দুটি ফুলদানি খোদাই করা।

(দ্রষ্টব্য: মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দুটি বিশেষ ভৈরব মূর্তি রয়েছে। প্রথম ভৈরব হলেন একপাদ বা অজৈকপাদ ভৈরব, যিনি এক পা ও ঊর্ধ্বলিঙ্গ বিশিষ্ট এবং পদ্মের ওপর দণ্ডায়মান। দ্বিতীয় ভৈরব হলেন দশভূজা, যিনি পদ্মাসনে বসা এবং রুদ্ররূপে ডমরু ও মুণ্ডপাত্র ধারণ করে আছেন।)

উপসংহার

হীরাপুরের এই প্রাচীন যোগিনী মন্দিরটি মূলত বেলেপাথর ও মোরাম দিয়ে নির্মিত। কালের বিবর্তনে মূল মন্দিরের মহাদেব মহাভৈরব এবং ৬১ নম্বর যোগিনী মূর্তিটি হারিয়ে গেলেও, বাকি ভাস্কর্যগুলোর সূক্ষ্ম কারুকাজ আজও ওড়িশার প্রাচীন শিল্পকলার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে টিকে রয়েছে। প্রাচীন ভারতের এই তান্ত্রিক ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলী আজও গবেষক ও দর্শনার্থীদের সমভাবে মুগ্ধ করে।

ব্যবহার বিধি

- গুরুত্বপূর্ণ শব্দ, প্রতীক ও অনুশীলনের উদ্দেশ্য আগে বুঝে নিন।
- শারীরিক বা মানসিক অস্বস্তি তৈরি হলে অনুশীলন বন্ধ করুন।
- কোনো আচারকে ভয়, জবরদস্তি বা প্রতারণার মাধ্যমে ব্যবহার করবেন না।